আলোর জানালা-(এক)


ওয়াজ কখন আছর করে
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর ওয়াজের এমন আছর শ্রোতাদের উপর হত যে, কেউ কেউ মনে করতো হযরত হয়ত শ্রোতাদের যাদু করে থাকেন আসলে এখানে যাদুমন্ত্রের কোনো ব্যাপার ছিল না ছিল কেবল ইখলাস, উম্মতের ইসলাহের ফিকির আন্তরিকতা সম্পর্কে হযরত নিজেই বলেন,

আমি যখন কাউকে কোনো নসীহত করি, তখন আমি মনে-প্রাণে কামনা করি সে যেন এরূপই (ভালো) হয়ে যায়
হযরত আরো বলেন, “আমি যখন নিজের মধ্যে কোনো ব্যাপারে ঘাটতি অনুভব করি এবং তা সংশোধনযোগ্য মনে করি, তখন সে ব্যাপারে ওয়াজ করি এতে আমার অনেক উপকার হয় কারণ বয়ান করার সময়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে ফলে অন্তরে এর খুবই আছর হয় ছাড়া লজ্জার অনুভুতিও থাকে যে, যে ব্যাপারে অন্যদের নসীহত করছি, সে ব্যাপারে নিজেরও আমল করা উচিত” [আশরাফুস সাওয়ানেহ 1/68]
ফরমায়েশী (অর্ডারী) ওয়াজ
হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ. কখনো কারো নির্দেশিত বিষয়ে ওয়াজ করতেন না ওয়াজ করার সময় আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে যে বিষয় মনে আসত সেটাই বয়ান করতেন একবার এক লোক বলল, হযরত ওয়াজে একটু ঢোল বাজানেওয়ালাদের খবর নিয়েন হযরত থানভী রহ. বললেন, আমি কারো সমালোচনা করে কথা বলি না এটা আমার অভ্যাস নয় আমার যা দরকারি বলে বুঝে আসবে, তাই বয়ান করবো
হযরত আরো বলেন, ওয়াজে সাধারণ মানুষের কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু উদ্দেশ্য হওয়া ঠিক নয় ফরমায়েশী বিষয় সাধারণত বিশেষ উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে ফলে ওয়াজের প্রতিক্রিয়াও খারাপই হয়ে থাকে [আশরাফুস সাওয়ানেহ 1/50]

আমার যৎসামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ওয়ায়েজকে যারা কোনো বিশেষ বিষয়ে বয়ান করার আবদার করেন, তাদের অনেকেরই নিয়ত ভালো থাকে না নিজের জন্য দরকার অথবা নিজের গায়ে পড়তে পারে এমন বিষয়ের কথা তারা বলেন না তারা আবদার করেন এমন বিষয়ের, যা সমাজের অন্যদের গায়ে পড়বে ক্ষেত্রে ওয়ায়েজ যদি কড়া আলোচনা করেন, তাহলে আবদারকারীরা খুবই খুশি হন কারণ তারা এটাই চেয়ে ছিলেন উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টা পরিষ্কার করি যে এলাকায় ওয়াজ মাহফিল, সে এলাকার কিছু সংখ্যক লোক সুদের ব্যাবসায় জড়িত সুতরাং সুদের উপর বয়ান হওয়া দরকার যেন লোকগুলি সুদের মতো কবিরা গোনাহ থেকে ফিরে আসতে পারে হিসেবে সুদের সাথে জড়িত নয়এমন কেউ এসে বললেন, হুজুর! সুদের উপর বয়ান করুন সমাজে এই সমস্যাটা আছে অনেকে এতটুকুও বলে দেন যে, হুজুর একটু কড়া করে বলবেন বাহ্যত, লোকটির আবদারটা ভালোই কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, লোকটার উদ্দেশ্য ভালো না তিনি অন্যদের সমস্যা বিষয়ে ওয়াজের আবেদন করলেন তাহলে কি তার নিজের মধ্যে সংশোধনযোগ্য কোন সমস্যা নেই তিনি কি একশভাগ কামেল হয়ে গেছেন আবেদনটা যদি এভাবে হতো তাহলে সমস্যার কিছু ছিল না হুজুর! আমার মধ্যে অনেক অহংকার আল্লাহপাক যেন কবীরা গোনাহ থেকে মুক্তি দেন, বিষয়ে কিছু কথা বলবেন হুজুর! আমার ঘরে পর্দা নেই আমার স্ত্রী-কন্যাদেরকে আমি বুঝিয়ে পারছি না বিষয়ে বয়ান করবেন, আল্লাহ যেন তাদেরকে হিদায়াত দান করেন হুজুর! আমার মধ্যে নামাযের গুরুত্ব কম মাঝে-মধ্যে কাজা হয়ে যায়, কখনো-কখনো জামাত ছুটে যায় নামাযে ধ্যান মনোযোগ নেই তাই বিষয়ে বয়ান করবেন, যেন আল্লাহ আমাকে ভালো নামাযী বানিয়ে দেন আমার এক যুগের অভিজ্ঞতা হলো এভাবে কেউ বলে না যেন ওয়াজ নিজের বা নিজেদের জন্য নয়, শুধুই অন্যদের জন্য কারণেই হয়তো হযরত হাকীমুল উম্মত কারো ফরমায়েশী বিষয়ে বয়ান করতেন না হযরতের বয়ানের ধারা থেকে এটাই বুঝে আসে যে, ওয়ায়েজ নিজেও এমন বিষয় নির্বাচন করবেন, যেখানে নিজেকে উদ্দেশ করে কথা বলতে পারেন ধরণের বয়ানই দরদমাখা হয় সকলের অন্তরে ক্রিয়াশীল হয় অন্যদের উদ্দেশ্যে ঝালঝাড়া’ ওয়াজে কোনো আছর নেই বরং অনেক ক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিরা ওয়ায়েজ তাঁর ওয়াজ নিয়ে নানা মন্তব্য করে নিজেদের ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় তাই পদ্ধতি ওয়াজের হিকমত পরিপন্থী    

Comments